NL24 News
০৮ আগস্ট, ২০২৬, 9:07 PM
কেয়া কসমেটিকসের ৮.৫ হাজার কোটি টাকা ‘উধাও’: চার সংস্থার যৌথ জালে ৪ বাণিজ্যিক ব্যাংক
রপ্তানির মাধ্যমে দেশে এসেছে সাড়ে আট হাজার কোটি টাকারও বেশি বৈদেশিক মুদ্রা। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ড্যাশবোর্ড থেকে শুরু করে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর ইস্যু করা সনদ- সব নথিতেই স্পষ্ট, রপ্তানি বাবদ ডলার দেশে এসেছে। কিন্তু বাস্তবে কেয়া কসমেটিকস লিমিটেডের ফরেন কারেন্সি অ্যাকাউন্টে সেই অর্থের এক সেন্টও জমা হয়নি। বরং বৈদেশিক মুদ্রার ওই অর্থ গায়েব করে গ্রাহকের ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে হাজার হাজার কোটি টাকার জোরপূর্বক ঋণ বা ‘ফোর্সড লোন’।
শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান কেয়া কসমেটিকস লিমিটেডের প্রায় দুই দশকের লেনদেন ঘিরে ওঠা এসব অভিযোগ দেশের ব্যাংকিং খাত এবং বৈদেশিক মুদ্রা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাকে গুরুতর প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।
চার বাণিজ্যিক ব্যাংকের মাধ্যমে উধাও হওয়ার অভিযোগ ওঠা মোট ৬৬ কোটি মার্কিন ডলারের- বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৮ হাজার ৫০০ কোটি টাকা- সিংহভাগই ঘটেছে সাউথইস্ট ব্যাংকের বিভিন্ন শাখার মাধ্যমে। ব্যাংকটির মাধ্যমে প্রায় ৩৯ কোটি ৪৬ লাখ মার্কিন ডলার গায়েব করার অভিযোগ রয়েছে। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ অর্থ উধাও হওয়ার অভিযোগ উঠেছে পূবালী ব্যাংকের বিরুদ্ধে- প্রায় ২০ কোটি ১৯ লাখ মার্কিন ডলার। এ ছাড়া ন্যাশনাল ব্যাংকের মাধ্যমে ৫ কোটি ৮৫ লাখ মার্কিন ডলার এবং স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের মাধ্যমে ৬৫ লাখ মার্কিন ডলার বৈদেশিক মুদ্রা ব্যাংকিং ব্যবস্থার বাইরে চলে যাওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক সংশ্লিষ্ট চার ব্যাংককেই কেয়া কসমেটিকসের অনুকূলে ‘প্রসিড রিয়েলাইজেশন সার্টিফিকেট’ (PRC) প্রদান করেছিল। অর্থাৎ রপ্তানি বাবদ বৈদেশিক মুদ্রা দেশে এসেছে—নথিপত্রে তার স্বীকৃতি রয়েছে। তবে অভিযোগ অনুযায়ী, ব্যাংকগুলো গ্রাহকের ফরেন কারেন্সি অ্যাকাউন্টে সেই অর্থ জমা না দেখিয়েই পুরো প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করেছে।
কেয়া গ্রুপের চেয়ারম্যান আব্দুল খালেক পাঠানের দাবি, সাউথইস্ট ব্যাংক নস্ট্রো অ্যাকাউন্ট থেকে সংশ্লিষ্ট পেমেন্ট কেটে রাখার পরও নিয়ম না মেনে গ্রাহকের অ্যাকাউন্ট থেকে পুনরায় অর্থ কেটে নিয়েছে। তাঁর অভিযোগ, এভাবে বেআইনিভাবে ‘ডাবল ডেবিটিং’ করা হয়েছে। পরে কৃত্রিমভাবে ফোর্সড লোন তৈরি করে তা দীর্ঘমেয়াদি টার্ম লোনে রূপান্তর করা হয়। এর মাধ্যমে কেয়া গ্রুপকে অন্যায্যভাবে প্রায় ২ হাজার ৭০০ কোটি টাকার ঋণখেলাপি বানানো হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন। তাঁর মতে, এর ফলে গ্রুপটির সচল ব্যবসা এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
গুরুতর এসব অভিযোগের বিষয়ে ব্যাংকগুলোর অবস্থানও ভিন্ন ভিন্ন। সাউথইস্ট ব্যাংক অভিযোগগুলো অস্বীকার করে বিএসইসির বিশেষ নিরীক্ষা প্রতিবেদনের জন্য অপেক্ষা করার কথা জানিয়েছে। অন্যদিকে স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক পুরো বিষয়টিকে ‘ভুল তথ্য’ বলে দাবি করেছে। তবে পূবালী ব্যাংক ও ন্যাশনাল ব্যাংক এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি।
পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনায় নিয়ে কেয়া কসমেটিকসের লেনদেন ও ব্যাংকিং কার্যক্রম নিয়ে একযোগে অনুসন্ধান চালাচ্ছে চারটি নিয়ন্ত্রক সংস্থা।
দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) মানি লন্ডারিং ও ব্যাংক জালিয়াতির অভিযোগের দিকটি খতিয়ে দেখতে সাউথইস্ট ব্যাংক ও বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে সংশ্লিষ্ট নথিপত্র তলব করেছে। পাশাপাশি কেয়া গ্রুপের চেয়ারম্যানকেও জিজ্ঞাসাবাদ করেছে সংস্থাটি।
ফাইন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং কাউন্সিল (এফআরসি) ব্যাংকের ঋণসংক্রান্ত রেকর্ড, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ড্যাশবোর্ডের তথ্য এবং কোম্পানির ব্যালান্স শিটের মধ্যে থাকা বড় ধরনের অসংগতি খতিয়ে দেখছে। একই সঙ্গে সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) নির্দেশে বিশেষ নিরীক্ষা চালাচ্ছে অডিট ফার্ম ‘পিকেএফ আজিজ হালিম কবির চৌধুরী’।
এদিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেছেন, ঘটনা ২০ বছর আগের হলেও ব্যাংকিং ব্যবস্থায় অনিয়ম এবং বৈদেশিক মুদ্রা গায়েবের সঙ্গে কেউ জড়িত থাকলে তাকে ছাড় দেওয়া হবে না।
কেয়া কসমেটিকসের এই ঘটনায় এখন মূল প্রশ্ন- নথিতে দেশে আসা দেখানো বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা কোথায় গেল, কীভাবে তা গ্রাহকের হিসাবে প্রতিফলিত হলো না এবং কারা এর দায় বহন করবে? নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর চলমান অনুসন্ধান ও বিশেষ নিরীক্ষায় এসব প্রশ্নের উত্তর কতটা স্পষ্ট হয়, এখন সেদিকেই নজর সংশ্লিষ্টদের।