ঢাকা ২৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
সংবাদ শিরোনাম
এস আলমের সময়ে ইসলামী ব্যাংকে ‘জরুরি’ ধারা ব্যবহার করে ব্যাপক নিয়োগ রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রে কয়লা আমদানি: জালিয়াতির নথি ও অদক্ষদের কাজ দেওয়ার অপচেষ্টা রাজউকের নকশা অনুমোদনে ওয়ানস্টপ, প্রকল্পে জবাবদিহি নিশ্চিতের উদ্যোগ প্রীতিলতার আত্মাহুতি দিবসে মঞ্চে ফিরছে ‘ট্রায়াল অব সূর্যসেন’ নতুন বাংলাদেশকে বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরার প্রস্তুতি, নিউইয়র্কে তারেক রহমান ভূরাজনীতির পালাবদলে বাংলাদেশের কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনের পরীক্ষা অভাব পেরিয়ে স্বাবলম্বিতার পথে বান্দরবানের ১০০ নারী ​কমব্যাট স্পোর্টসে নতুন ইতিহাস: 'জেডএফসি ২'-এ দেশি-বিদেশি ফাইটারদের লড়াই বিশ্বমানের জুলকান ইনডোর এরিনা: দেশীয় ফাইটারদের আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্ম পর্যটনপণ্য ও সেবা নিয়ে আইসিসিবিতে মেলা

রাজপথের রাজনীতি নাকি গণতান্ত্রিক প্রতিযোগিতা

#

নিজস্ব প্রতিবেদক

২০ জুলাই, ২০২৬,  12:54 PM

news image

বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে বিদেশি হস্তক্ষেপ বা ষড়যন্ত্রের অভিযোগ নতুন কোনো বিষয় নয়। বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক দল ও নেতারা এ ধরনের অভিযোগ তুলে জনমনে জাতীয়তাবাদী আবেগ সৃষ্টি করার চেষ্টা করেছেন।

সম্প্রতি জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার দাবি করেছেন, বাংলাদেশের রাজনীতি নাকি ‘দিল্লির রিমোট কন্ট্রোলে’ পরিচালিত হচ্ছে। বক্তব্যটি রাজনৈতিক বিতর্কের জন্ম দিলেও এর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—এমন মন্তব্যের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য কী এবং এই মুহূর্তে তা কেন সামনে আনা হচ্ছে?

বাস্তবতা হলো, অল্প কিছুদিন আগেই জামায়াত বিদ্যমান সাংবিধানিক কাঠামোর অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে অংশ নিয়েছে। নির্বাচনের ফলাফলও দলটি প্রত্যাখ্যান করেনি। কিন্তু এখন তাদের বক্তব্য এমন একটি ধারণা তৈরি করছে, যেন বর্তমান রাজনৈতিক ব্যবস্থাই স্বাধীনভাবে পরিচালিত হচ্ছে না। এতে পরোক্ষভাবে শুধু রাষ্ট্রীয় কাঠামো নয়, বিএনপির নেতৃত্বাধীন সরকারের বৈধতা ও স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতাও প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে।

যদি সত্যিই দেশের রাজনীতি কোনো বিদেশি শক্তির নির্দেশনায় পরিচালিত হয়, তাহলে নির্বাচিত সরকারের কার্যকর ক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। কিন্তু এত বড় দাবি কেবল রাজনৈতিক বক্তব্যের ওপর দাঁড়িয়ে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে না। এমন অভিযোগের পক্ষে প্রয়োজন নির্ভরযোগ্য ও সুস্পষ্ট প্রমাণ। অন্যথায় তা রাজনৈতিক স্লোগান হিসেবেই বিবেচিত হবে।

ভারতের নীতির সমালোচনা অবশ্যই করা যেতে পারে। ভৌগোলিক অবস্থান, অর্থনৈতিক সম্পর্ক, নিরাপত্তা সহযোগিতা ও কূটনৈতিক বাস্তবতার কারণে বাংলাদেশে ভারতের প্রভাব রয়েছে—এ কথা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। একইভাবে বিশ্বের অন্যান্য আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক শক্তিও প্রতিবেশী দেশগুলোর ওপর বিভিন্ন মাত্রায় প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করে। এটি আন্তর্জাতিক রাজনীতির স্বাভাবিক বাস্তবতা।

কিন্তু প্রভাব বিস্তার এবং সরাসরি নিয়ন্ত্রণ—এই দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। বাংলাদেশের রাজনীতি, অর্থনীতি, বাণিজ্য কিংবা সাংস্কৃতিক অঙ্গন সবই দিল্লি থেকে পরিচালিত হয়—এমন দাবি অত্যন্ত গুরুতর। তাই এমন বক্তব্যের ক্ষেত্রে তথ্য-প্রমাণের মানও সমানভাবে শক্তিশালী হতে হবে।

নির্বাচনের পর থেকে জামায়াতের বিভিন্ন বক্তব্যে আরেকটি প্রবণতা লক্ষ করা যাচ্ছে। দলটি বারবার আন্দোলন ও রাজপথের কর্মসূচির ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। বিরোধী দলের শান্তিপূর্ণ আন্দোলন বা সরকারের সমালোচনা করার অধিকার গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তবে নির্বাচিত সরকারকে অস্থিতিশীল করার উদ্দেশ্যে ধারাবাহিক রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি করার কৌশল গণতান্ত্রিক সংস্কৃতিকে দুর্বল করে দিতে পারে।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস এ বিষয়ে সতর্কবার্তা বহন করে। যখনই রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা সংসদের পরিবর্তে রাজপথে স্থানান্তরিত হয়েছে কিংবা নির্বাচনী প্রক্রিয়ার পরিবর্তে সংঘাত ও অস্থিতিশীলতা প্রাধান্য পেয়েছে, তখনই দেশের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান, প্রশাসনিক সক্ষমতা এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সেই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেওয়া জরুরি।

কোনো রাজনৈতিক দল যদি বিশ্বাস করে যে জনগণের সমর্থন তাদের পক্ষে রয়েছে, তাহলে সেই সমর্থনের সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য পরীক্ষা হলো নির্বাচন। গণআন্দোলনেরও গণতন্ত্রে একটি বৈধ ভূমিকা আছে, তবে তা কখনোই জনগণের ভোটে অর্জিত বৈধতার বিকল্প হতে পারে না।

এখানে একটি স্পষ্ট বৈপরীত্যও রয়েছে। জামায়াত প্রায়ই বিদেশি প্রভাব বা হস্তক্ষেপের সমালোচনা করে। অথচ বাস্তবে দলটি নিজেও বিভিন্ন দেশের রাজনৈতিক, কূটনৈতিক ও ধর্মীয় মহলের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখে এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে যোগাযোগ সম্প্রসারণের চেষ্টা করে। আংকারা, ইসলামাবাদ কিংবা ওয়াশিংটনের মতো গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রগুলোতে তাদের কূটনৈতিক তৎপরতার খবরও নতুন নয়।

আন্তর্জাতিক যোগাযোগ রাখা কোনো রাজনৈতিক দলের জন্য অস্বাভাবিক নয়। বরং এটি আধুনিক রাজনীতির অংশ। কিন্তু যদি নিজের ক্ষেত্রে এই যোগাযোগ গ্রহণযোগ্য হয়, তাহলে প্রতিপক্ষের আন্তর্জাতিক সম্পর্ককে কেবল ষড়যন্ত্র হিসেবে চিহ্নিত করা নীতিগতভাবে অসামঞ্জস্যপূর্ণ।

জামায়াতের বর্তমান রাজনীতিকে তাদের অতীত থেকেও পুরোপুরি আলাদা করে দেখা যায় না। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে দলটির ভূমিকা ও অবস্থান দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। সেই ইতিহাস আজও জনমতকে প্রভাবিত করে। ইতিহাস কোনো দলের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের একমাত্র মানদণ্ড নয়, কিন্তু অতীতকে অস্বীকার করেও রাজনৈতিক বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জন করা সম্ভব নয়।

বর্তমানে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক চাপ, সুশাসনের সংকট, জননিরাপত্তা, সাংবিধানিক সংস্কার এবং জলবায়ু পরিবর্তনের মতো বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। এসব সমস্যার সমাধানে প্রয়োজন দায়িত্বশীল রাজনৈতিক নেতৃত্ব, বাস্তবভিত্তিক নীতিগত আলোচনা এবং গঠনমূলক বিতর্ক।

কিন্তু এসব জটিল সমস্যার ব্যাখ্যা যদি কেবল কোনো বিদেশি ‘রিমোট কন্ট্রোল’ বা ষড়যন্ত্রতত্ত্বের মাধ্যমে দেওয়া হয়, তাহলে তা গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করার পরিবর্তে আরও দুর্বল করে তুলবে। গণতন্ত্র বিকশিত হয় তথ্যনির্ভর বিতর্ক, যুক্তিপূর্ণ সমালোচনা এবং শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার মধ্য দিয়ে। প্রমাণহীন অভিযোগ ও ষড়যন্ত্রের বয়ান সেই পরিবেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।

গণতন্ত্রের মৌলিক নীতি হলো—সরকার তার বৈধতা অর্জন করে জনগণের ভোট থেকে। জনগণ চাইলে পরবর্তী নির্বাচনে সেই ম্যান্ডেট নবায়ন করতে পারে, পরিবর্তন করতে পারে কিংবা প্রত্যাহারও করতে পারে। কিন্তু কোনো সরকারকে চ্যালেঞ্জ করার বৈধ পথ ষড়যন্ত্রতত্ত্ব বা সংঘাতের রাজনীতি নয়; সেই পথের নাম অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন।

logo

সম্পাদক ও প্রকাশক : তানভীর সানি