নিজস্ব প্রতিবেদক
১৭ ডিসেম্বর, ২০২৫, 6:54 PM
পাল্টাপাল্টি তলব ও চরমপন্থা ইস্যু: ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কে টানাপোড়েনের নতুন মাত্রা
দক্ষিণ এশিয়ার দুই নিকট প্রতিবেশী বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার কূটনৈতিক সম্পর্ক এখন এক জটিল সন্ধিক্ষণে। বুধবার (১৭ ডিসেম্বর) নয়াদিল্লিতে নিযুক্ত বাংলাদেশের হাইকমিশনার এম রিয়াজ হামিদুল্লাহকে তলব এবং পরবর্তীতে ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কড়া বিবৃতি সেই তিক্ততারই নতুন বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, দুই দেশের এই ‘পাল্টাপাল্টি তলব’ এবং পাল্টাপাল্টি অভিযোগের সংস্কৃতি দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের জন্য এক বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
১. ‘নিরাপত্তা’ যখন বড় অজুহাত
ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিজ্ঞপ্তিতে বাংলাদেশে ‘ক্রমাবনতিশীল নিরাপত্তা পরিস্থিতি’ এবং ‘চরমপন্থী গোষ্ঠীর’ তৎপরতাকে প্রধান কারণ হিসেবে দেখানো হয়েছে। বিশেষ করে ঢাকায় ভারতীয় হাইকমিশন ঘিরে বিক্ষোভের পরিকল্পনাকে দিল্লি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে নিয়েছে। কূটনীতিকদের মতে, ভারত এই বার্তার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক মহলে একটি ধারণা দেওয়ার চেষ্টা করছে যে, বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের পাশাপাশি বিদেশি কূটনীতিকরাও নিরাপদ নন।
২. শেখ হাসিনা ইস্যু ও ঢাকার চাপ
কূটনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা রয়েছে যে, কয়েক দিন আগে ঢাকায় ভারতীয় হাইকমিশনার প্রণয় ভার্মাকে তলব করার পাল্টা জবাব হিসেবেই আজ রিয়াজ হামিদুল্লাহকে তলব করা হয়েছে। ভারতে অবস্থানরত শেখ হাসিনার ‘উস্কানিমূলক’ অডিও বার্তা নিয়ে ঢাকা যে শক্ত অবস্থান নিয়েছে, দিল্লি সম্ভবত এই তলবের মাধ্যমে সেই চাপকে প্রশমিত করতে চাইছে। অর্থাৎ, ‘আক্রমণই যখন রক্ষণভাগ’—এই নীতিতে হাঁটছে ভারত।
৩. তদন্ত ও তথ্যের গরমিল
দিল্লির অভিযোগ, বাংলাদেশে ঘটে যাওয়া বিভিন্ন ঘটনার বিষয়ে অন্তর্বর্তী সরকার ‘পূর্ণাঙ্গ তদন্ত’ করেনি বা ভারতের সাথে তথ্য বিনিময় করেনি। এটি বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্র ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সক্ষমতা এবং সদিচ্ছার ওপর একটি প্রশ্ন তোলার চেষ্টা। অন্যদিকে, বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে বারবার বলা হচ্ছে যে, ভারতের গণমাধ্যমগুলো বাংলাদেশে ঘটে যাওয়া বিচ্ছিন্ন ঘটনাগুলোকে অতিরঞ্জিত করে ‘ভুয়া বয়ান’ তৈরি করছে।
৪. নির্বাচনের আহ্বান ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন
ভারতীয় বিবৃতিতে ‘অবাধ, সুষ্ঠু ও অন্তর্ভুক্তিমূলক’ নির্বাচনের কথা পুনরায় উল্লেখ করা হয়েছে। একটি দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক রোডম্যাপ নিয়ে প্রতিবেশী দেশের এই প্রকাশ্য বক্তব্যকে ঢাকার অনেকেই সার্বভৌমত্বের ওপর হস্তক্ষেপ হিসেবে দেখছেন। অন্তর্বর্তী সরকার যখন রাষ্ট্র সংস্কারের কাজে ব্যস্ত, তখন ভারতের এই ‘নির্বাচনী চাপ’ দ্বিপাক্ষিক আস্থায় ফাটল ধরাতে পারে।
৫. ঐতিহাসিক সম্পর্ক বনাম বর্তমান বাস্তবতা
বিজ্ঞপ্তিতে ভারত মুক্তিযুদ্ধের ঐতিহ্যের কথা বললেও বর্তমান বাস্তবতায় দুই দেশের সম্পর্ক অনেকটা ‘অবিশ্বাসের দোলাচলে’ দুলছে। শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর থেকে ক্ষমতার যে নতুন ভারসাম্য তৈরি হয়েছে, তার সাথে দিল্লি এখনো পুরোপুরি খাপ খাইয়ে নিতে পারেনি বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
দুই দেশের হাইকমিশনারদের তলব করার ঘটনাটি নিছক কূটনৈতিক প্রটোকল নয়, বরং এটি একটি গভীর সংকটের ইঙ্গিত। বাংলাদেশে ভারতীয় মিশনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যেমন অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব, তেমনি ভারতের মাটিতে বসে সাবেক প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণ করাও দিল্লির জন্য এখন বড় অগ্নিপরীক্ষা। এই সংকট নিরসনে দ্রুত উচ্চপর্যায়ের অর্থবহ সংলাপের বিকল্প নেই।