নিজস্ব প্রতিবেদক
১৬ ডিসেম্বর, ২০২৫, 10:26 PM
প্রধান উপদেষ্টার জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণ: সহিংসতা মোকাবিলা ও তরুণ যোদ্ধাদের সুরক্ষা নিয়ে ড. ইউনূস
মহান বিজয় দিবস উপলক্ষে জাতির উদ্দেশ্যে দেওয়া ভাষণে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস দেশে অস্থিরতা সৃষ্টির অপচেষ্টার তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। তিনি সহিংসতা ও চোরাগোপ্তা হামলার মাধ্যমে দেশে অস্থিতিশীলতা তৈরি করতে চাওয়া 'দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাওয়া শক্তিগুলোকে' হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। একইসাথে, তিনি তরুণ যোদ্ধাদের রক্ষা করার এবং একটি উৎসবমুখর নির্বাচনের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রা বজায় রাখার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন।
সহিংসতা ও ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে কঠোর হুঁশিয়ারি
প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূস বলেন, নির্বাচনের আগে সহিংসতা ও চোরাগোপ্তা হামলার মাধ্যমে দেশে অস্থিরতা সৃষ্টির অপচেষ্টা চলছে। তিনি মনে করেন, "দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাওয়া শক্তিগুলো বুঝে গেছে তরুণ যোদ্ধারাই তাদের পুনরুত্থানে বড় বাধা।" তাই নির্বাচন আসার আগেই তারা এই বাধা সরিয়ে নিজেদের রাজত্ব কায়েম করতে মরিয়া হয়ে উঠেছে।
শরিফ ওসমান হাদীর উপর হামলা বাংলাদেশের অস্তিত্বের ওপর আঘাত
ভাষণে ড. ইউনূস সম্প্রতি 'জুলাই অভ্যুত্থানের সম্মুখযোদ্ধা ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র' শরিফ ওসমান হাদীর ওপর হামলার ঘটনা উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, "তা শুধু একজন ব্যক্তির ওপর আঘাত নয়— এটি বাংলাদেশের অস্তিত্বের ওপর আঘাত, আমাদের গণতান্ত্রিক পথচলার ওপর আঘাত।"
চিকিৎসা: সংকটাপন্ন শরিফ ওসমান হাদীর উন্নত চিকিৎসার জন্য সরকার তাকে সিঙ্গাপুরে পাঠিয়েছে।
আশ্বাস: প্রধান উপদেষ্টা দেশবাসীকে আশ্বস্ত করেছেন যে, ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের প্রাথমিকভাবে চিহ্নিত করা হয়েছে এবং এই ষড়যন্ত্রে জড়িতদের কাউকে "ছাড় দেওয়া হবে না।"
তিনি কঠোরভাবে ঘোষণা করেন, "পরাজিত শক্তি, ফ্যাসিস্ট টেরোরিস্টদের এই অপচেষ্টা সম্পূর্ণভাবে ব্যর্থ করে দেওয়া হবে। ভয় দেখিয়ে, সন্ত্রাস ঘটিয়ে বা রক্ত ঝরিয়ে এই দেশের গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রা কেউ থামাতে পারবে না।"
তরুণদের সুরক্ষা এবং ঐক্যবদ্ধ মোকাবিলা
ড. ইউনূস তরুণদের রক্ষা করার আহ্বান জানিয়ে বলেন, যারা দেশ ছেড়ে পালিয়েছে, তারা এই "অস্ত্রহীন, ভীতিহীন, ব্যক্তিগত স্বার্থ সম্বন্ধে সম্পূর্ণ উদাসীন" তরুণ যোদ্ধাদের নিয়ে সাংঘাতিক ভীত। তাদের লক্ষ্য হলো নির্বাচনের আগেই এই বাধা সরিয়ে ফেলা।
নির্বাচন পূর্ববর্তী তৎপরতা: তিনি সতর্ক করেন যে নির্বাচনের পরে তাদের বন্ধুরা সমর্থন জোগাতে বেকায়দায় পড়বে, তাই তারা নির্বাচনের আগেই ফিরে আসা নিশ্চিত করতে "নানা ভঙ্গিতে" চেষ্টা করছে।
আহ্বান: ড. ইউনূস দেশের সবাইকে "জোর গলায়" বলতে হবে, "আমরা তরুণদের রক্ষা করবো।"
ঐক্যবদ্ধতা: তিনি সংযম বজায় রাখার, অপপ্রচার বা গুজবে কান না দেওয়ার এবং "ফ্যাসিস্ট টেরোরিস্ট, যারা অস্থিরতা সৃষ্টি করতে চায়, আমরা অবশ্যই ঐক্যবদ্ধ হয়ে তাদের মোকাবিলা করব। তাদের ফাঁদে পা দেব না" বলে আহ্বান জানান।
উৎসবমুখর নির্বাচনের প্রস্তুতি
প্রধান উপদেষ্টা বলেন, নির্বাচন অব্দি আর মাত্র দু’মাস বাকি। তিনি আশা প্রকাশ করেন, "উৎসবমুখর, শান্তিপূর্ণ নির্বাচন করে আমরা সবাই মিলে দেশের ওপর আমাদের পরিপূর্ণ দখল প্রতিষ্ঠিত করব।"
তরুণদের ভূমিকা: তিনি বলেন, কিশোর-কিশোরী, তরুণ-তরুণীরা তাদের ভয়-ডরহীনতার মাধ্যমে নির্বাচনের আগের এই দু’মাসকে "উৎসবমুখর করে রাখবে" এবং দেশকে হিংসা, কোন্দল থেকে বাঁচিয়ে রাখবে।
ভোটের গুরুত্ব: তিনি বলেন, ভোট শুধু "কাগজে একটি সিল মারার আনুষ্ঠানিকতা" নয়; বরং এটি হবে "নতুন রাষ্ট্র বিনির্মাণে আপনার সক্রিয় অংশগ্রহণ, গণতান্ত্রিক অধিকার চর্চা এবং দেশকে এগিয়ে নিতে সরাসরি অবদান।"
রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি আহ্বান: ড. ইউনূস রাজনৈতিক নেতাদের প্রতি আহ্বান জানান, "আপনারা একে অপরকে প্রতিযোগী হিসেবে দেখবেন, কখনো শত্রু হিসেবে দেখবেন না।"
খালেদা জিয়ার চিকিৎসা: পরিবারের ইচ্ছাকে সম্মান
জাতির উদ্দেশ্যে দেওয়া ভাষণে প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূস জাতীয় নেত্রী, তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী এবং বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়ার অসুস্থতার বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
সর্বোচ্চ গুরুত্ব: অন্তর্বর্তী সরকার শুরু থেকেই খালেদা জিয়ার অসুস্থতার বিষয়টিকে "সর্বোচ্চ গুরুত্ব" দিয়ে আসছে।
বিশেষ মর্যাদা: তার অবদান ও জনগণের শ্রদ্ধাকে বিবেচনায় নিয়ে সরকার এরইমধ্যে তাকে "রাষ্ট্রের অতিগুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হিসেবে ঘোষণা" দিয়েছে।
সহযোগিতা: ড. ইউনূস নিশ্চিত করেন যে, "সরকারের পক্ষ থেকে তার চিকিৎসা নিশ্চিত করতে পরিবারের ইচ্ছাকে সম্মান দেখিয়ে প্রয়োজনীয় সব ধরনের সহযোগিতা দেওয়া হচ্ছে।" দেশের পাশাপাশি "প্রয়োজনে বিদেশে উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থাসহ সব বিষয় বিবেচনায় রয়েছে।"