নিজস্ব প্রতিবেদক
০৯ আগস্ট, ২০২৬, 2:10 PM
মুক্তিযুদ্ধের ছবিতে জামায়াত কোথায়! প্রদর্শনী ঘিরে প্রশ্ন
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের প্রায় আট দশকের ঘটনাপ্রবাহ আলোকচিত্রে তুলে ধরেছে জামায়াতে ইসলামী। ১৯৪৭ সালের দেশভাগ, পাকিস্তানি শাসন, মুক্তিযুদ্ধ, সামরিক শাসন, স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন, শেখ হাসিনার দীর্ঘ শাসন এবং ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থান—সবই ঠাঁই পেয়েছে রাজধানীর মিন্টো রোডে আয়োজিত প্রদর্শনীতে। কিন্তু সেই ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে জামায়াতে ইসলামীর তৎকালীন ভূমিকা সেখানে অনুপস্থিত।
বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াত আমির ডা. শফিকুর রহমানের সরকারি বাসভবনে আয়োজিত চার দিনের এই প্রদর্শনীর নাম ‘জুলাই এখনও শেষ হয় নাই’। গতকাল শেষ দিনে প্রদর্শনী দেখতে আসা দর্শনার্থীদের মধ্যেও এ বিষয়টি নিয়ে আলোচনা ও সমালোচনা হয়েছে।
প্রদর্শনীতে শতাধিক আলোকচিত্রের মাধ্যমে বাংলাদেশের ইতিহাসের বিভিন্ন বাঁক তুলে ধরা হলেও ১৯৭১ সালে জামায়াতের তৎকালীন নেতাদের কর্মকাণ্ডের কোনো ছবি বা তথ্য উপস্থাপন করা হয়নি। অথচ পাকিস্তানি বাহিনীর হত্যাকাণ্ড, নির্যাতন এবং মুক্তিযুদ্ধের নানা ঘটনা যথেষ্ট গুরুত্বের সঙ্গে প্রদর্শিত হয়েছে।
প্রদর্শনীর শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবর্তনের ধারাবাহিকতা তুলে ধরার চেষ্টা রয়েছে। ১৯৪৭ সালের ভারত বিভক্তির পরিকল্পনা নিয়ে বিভিন্ন বৈঠকের ছবি দিয়ে শুরু হয়েছে উপস্থাপনা। এরপর এসেছে মুক্তিযুদ্ধের নানা মুহূর্ত।
৭ মার্চের ভাষণ, মুক্তিযুদ্ধের সময়কার বিভিন্ন ঘটনা এবং বিজয়ের ছবি রাখা হয়েছে। পাকিস্তানি বাহিনীর নির্যাতনের দৃশ্যও রয়েছে। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের সময় জামায়াতের অবস্থান কিংবা দলটির নেতাদের বিতর্কিত ভূমিকা নিয়ে কোনো আলোকচিত্র নেই।
ফলে প্রদর্শনীতে মুক্তিযুদ্ধের সময়কার রাজনৈতিক বাস্তবতার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ অনুপস্থিত বলে মনে করছেন সমালোচকরা। তাঁদের প্রশ্ন, যুদ্ধের সময় পাকিস্তানি বাহিনীর কর্মকাণ্ড যদি ইতিহাসের অংশ হিসেবে ছবিতে তুলে ধরা হয়, তাহলে সেই সময়ের রাজনৈতিক শক্তিগুলোর ভূমিকা কেন থাকবে না?
প্রদর্শনীতে ১৯৭১-এর পাশাপাশি স্বাধীনতার পরবর্তী রাজনৈতিক ইতিহাসও নির্দিষ্ট দৃষ্টিভঙ্গিতে উপস্থাপন করা হয়েছে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের শাসনামলকে ‘একনায়কতন্ত্র’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এইচ এম এরশাদের শাসনকে বলা হয়েছে ‘সামরিক স্বৈরশাসন’। শেখ হাসিনার শাসনামলকে দেখানো হয়েছে ‘ফ্যাসিবাদ’ হিসেবে।
অন্যদিকে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের কোনো ছবি প্রদর্শনীতে দেখা যায়নি। একইভাবে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সরকার ও তাঁর সময়কার রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহও আলোকচিত্রের মাধ্যমে উপস্থাপিত হয়নি।
প্রদর্শনী ঘুরে দেখা দর্শনার্থীদের মধ্যেও বিষয়টি নিয়ে ভিন্ন প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে।
মিরপুর থেকে আসা দর্শনার্থী ফয়েজ বলেন, ‘যদি জামায়াত ইতিহাস বিকৃত করে তাহলে তাদেরও ইতিহাস থেকে ফেলে দেবে এ দেশের সচেতন জনসাধারণ।’
স্বামীর সঙ্গে প্রদর্শনী দেখতে আসা মুসফিকা তাসনীম বলেন, প্রদর্শনীতে কিছু বিষয় দেখে তিনি হতাশ হয়েছেন। তাঁর ভাষায়, ‘আলোকচিত্রে কেন এসব ইতিহাস নেই তা জামায়াত ভালো বলতে পারবে।’
তবে শেখ মুজিবুর রহমানকে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের অংশ হিসেবে যথাযথভাবে তুলে ধরায় তিনি ইতিবাচক প্রতিক্রিয়াও জানান। তাঁর মতে, প্রদর্শনীতে ইতিহাসের কিছু গুরুত্বপূর্ণ অংশ থাকলেও পুরো উপস্থাপনাটি পরিপূর্ণ নয়।
একাত্তরের ভূমিকা কেন প্রদর্শনীতে নেই—এ প্রশ্নের জবাবে জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, একটি প্রদর্শনীর পরিসরে সব ঘটনা তুলে ধরা সম্ভব নয়।
তিনি বলেন, প্রদর্শনীতে মূলত জুলাই আন্দোলনকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সে কারণে ইতিহাসের অনেক ঘটনা এখানে আসেনি। প্রদর্শনীর সঙ্গে সম্পর্কিত ও প্রাসঙ্গিক বিষয়গুলোই বাছাই করে রাখা হয়েছে।
তবে জামায়াতের এই ব্যাখ্যায় সন্তুষ্ট নন মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত ব্যক্তিদের কেউ কেউ।
জাতীয়তাবাদী মুক্তিযোদ্ধা দলের সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা ইশতিয়াক আজিজ উলফাত বলেন, মুক্তিযুদ্ধের সময় জামায়াত বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছে এবং পাকিস্তানি বাহিনীর পক্ষে অবস্থান নিয়েছে।
তিনি বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধের সময় জামায়াত আমাদের গুলি করেছে। তারা বাংলাদেশের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে। এ দেশটাকে তারা চায়নি।’
একাত্তরের পরাজিত শক্তি হিসেবে জামায়াতকে উল্লেখ করে তিনি দলটির বর্তমান রাজনৈতিক অবস্থান নিয়েও সমালোচনা করেন। তাঁর দাবি, রাজনৈতিকভাবে একাধিকবার সুযোগ পেলেও দলটির মৌলিক চরিত্রের পরিবর্তন হয়নি।
মুক্তিযোদ্ধা ও বিশ্লেষক মফিদুল হক মনে করেন, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস থেকে ১৯৭১ সালের রাজনৈতিক বাস্তবতা বাদ দেওয়ার সুযোগ নেই।
তিনি বলেন, ১৯৭১ সালে বাংলাদেশে সংঘটিত গণহত্যা ছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সবচেয়ে ভয়াবহ ঘটনাগুলোর একটি। ফলে এই সময়ের ইতিহাস উপস্থাপন করতে গেলে সে সময়ের রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থানও আলোচনায় আসতে হবে।
মফিদুল হকের ভাষায়, ‘এটা বলতে গেলে জামায়াতকে নিশ্চয় তাদের অবস্থানটা সুস্পষ্ট করতে হবে।’
তিনি আরও বলেন, মুক্তিযুদ্ধের সময় সংঘটিত গণহত্যা মানবসভ্যতার ইতিহাসের একটি কলঙ্কজনক অধ্যায়। কোনো রাজনৈতিক দল যদি সেই ইতিহাসকে আড়াল বা বিকৃত করার চেষ্টা করে, তা গ্রহণযোগ্য নয়।
প্রদর্শনীর ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় ১৯৪৭ সালের জন্য ব্যবহার করা হয়েছে—‘স্বাধীনতা এলো, রাষ্ট্র বদলাল না। জুলুমবাজ আইয়ুব ও ইয়াহিয়া খানের উত্থান হলো।’
১৯৭১ সালের ক্ষেত্রে বলা হয়েছে—‘দেশ স্বাধীন হলো, রাষ্ট্র বদলাল না। একনায়ক শেখ মুজিবুর রহমানের উত্থান হলো।’
১৯৭৫ সালের ঘটনাকে বলা হয়েছে—‘একনায়ক শেখ মুজিবুর রহমানের পতন হলো, রাষ্ট্র বদলাল না।’
১৯৯০ সালের ক্ষেত্রে প্রদর্শনীতে উঠে এসেছে—‘গণঅভ্যুত্থানে একনায়ক এরশাদের পতন হলো, রাষ্ট্র বদলাল না।’
২০০৯ সালের জন্য বলা হয়েছে—‘নতুন সরকার এলো, রাষ্ট্র বদলাল না। ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার উত্থান হলো।’
আর ২০২৪ সালের বয়ান—‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান হলো। ফ্যাসিস্ট হাসিনার পতন হলো। আবার ফ্যাসিবাদ?’
সবশেষে ‘আমাদেরকে পারতেই হবে, জুলাই এখনও শেষ হয় নাই’ শিরোনামে জামায়াত তাদের রাজনৈতিক ব্যাখ্যা তুলে ধরেছে। সেখানে বাংলাদেশের ইতিহাসকে ‘অসমাপ্ত বিপ্লবের ইতিহাস’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।
জামায়াতের ভাষ্য অনুযায়ী, বিভিন্ন সময়ে আন্দোলন ও সংগ্রামের মধ্য দিয়ে নতুন স্বপ্ন তৈরি হলেও রাষ্ট্রকাঠামো এবং সংবিধানের মৌলিক সংস্কার না হওয়ায় কর্তৃত্ববাদ বারবার ফিরে এসেছে। তাদের মতে, ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থান সেই ধারাবাহিকতা ভাঙার একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ।
প্রদর্শনীর শেষ প্রান্তে দর্শনার্থীদের সামনে তাই রাখা হয়েছে একটি প্রশ্ন—‘আমরা কি পারব?’
তবে প্রদর্শনীর বয়ানে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে জামায়াতে ইসলামীর তৎকালীন ভূমিকার অনুপস্থিতিই এখন সবচেয়ে বেশি আলোচনার জন্ম দিয়েছে। ইতিহাসের কোন অংশ সামনে আনা হবে আর কোন অংশ বাদ যাবে—এই প্রশ্নকে কেন্দ্র করেই প্রদর্শনীটির নিরপেক্ষতা ও পূর্ণতা নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে।