আভানের মৃত্যু নিয়ে ইউনিভার্সেল মেডিকেলের ব্যাখ্যা, ‘চিকিৎসায় কোনো গাফিলতি হয়নি’
নিজস্ব প্রতিবেদক
০৮ অক্টোবর, ২০২৬, 8:57 PM
নিজস্ব প্রতিবেদক
০৮ অক্টোবর, ২০২৬, 8:57 PM
আভানের মৃত্যু নিয়ে ইউনিভার্সেল মেডিকেলের ব্যাখ্যা, ‘চিকিৎসায় কোনো গাফিলতি হয়নি’
ডেঙ্গু শক সিনড্রোমে আক্রান্ত চার বছরের শিশু ওয়াইজ কুরুনী আভানের মৃত্যুতে চিকিৎসায় গাফিলতির অভিযোগ অস্বীকার করেছে রাজধানীর ইউনিভার্সেল মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দাবি, শিশুটিকে বাঁচাতে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত প্রয়োজনীয় ও জীবনরক্ষাকারী সব ধরনের চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে।
একই সঙ্গে আভানের মৃত্যু ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে খণ্ডিত ও বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়িয়ে চিকিৎসক ও হাসপাতালের বিরুদ্ধে জনরোষ তৈরির চেষ্টা চলছে বলেও অভিযোগ করেছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।
এক বিবৃতিতে ইউনিভার্সেল মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল জানায়, গত ২৮ সেপ্টেম্বর রাতে জ্বর ও নাক দিয়ে রক্তপাত নিয়ে চার বছর বয়সী আভানকে হাসপাতালে আনা হয়। হেমোরেজিক ডেঙ্গুর সন্দেহে প্রাথমিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর তাকে শিশু ওয়ার্ডে ভর্তি করা হয়। পরবর্তী পরীক্ষায় ব্যাকটেরিয়াল ইনফেকশনের উপস্থিতি পাওয়ায় অ্যান্টিবায়োটিক শুরু করা হয়।
হাসপাতালের ভাষ্য অনুযায়ী, ডেঙ্গু পরীক্ষার ফল নেগেটিভ এলেও সিআরপি, ফেরিটিন, প্রোক্যালসিটোনিন, এসজিপিটি ও এসজিওটির মতো বিভিন্ন পরীক্ষার ফল ডেঙ্গু এক্সটেন্ডেড সিনড্রোমের সঙ্গে ক্লিনিক্যালি সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল। সে অনুযায়ী শিশুটির চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়া হয়।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, ১ অক্টোবর সন্ধ্যার পর আভানের ভাইটালস ধীরে ধীরে খারাপ হতে শুরু করে। পরিস্থিতি বিবেচনায় প্রফেসর ডা. মাহফুজা শিরীন শিশুটিকে নিবিড় পর্যবেক্ষণের জন্য পিআইসিইউতে স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত দেন। তবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দাবি, সে সময় শিশুটির মা পিআইসিইউতে নিতে অনাগ্রহ প্রকাশ করেন।
পরদিন ২ অক্টোবর সকালে শিশুটির রক্তচাপ আরও কমে গেলে ওয়ার্ডেই ফ্লুইড দেওয়া শুরু হয়। দুপুরে পুনরায় রোগী দেখে প্রফেসর মাহফুজা শিরীন দ্রুত পিআইসিইউতে স্থানান্তরের পরামর্শ দেন। পরে স্বজনরা সম্মতি দিলে বিকেল ৪টার দিকে আভানকে পিআইসিইউতে নেওয়া হয়।
হাসপাতাল জানায়, পিআইসিইউতে নেওয়ার পর রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে হার্টসল, প্লাজমাসল, ডোব্যুটামিন ও নর-অ্যাড্রেনালিনসহ প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দেওয়া হয়। তবে চিকিৎসা চলার মধ্যেও শিশুটির শারীরিক অবস্থার অবনতি অব্যাহত থাকে।
৩ অক্টোবর সকালে ট্রপোনিন-আই ও প্রো-বিএনপির মাত্রা বেড়ে যাওয়ায় মায়োকার্ডাইটিসের সম্ভাবনা বিবেচনায় নেওয়া হয়। এ সময় শিশুটিকে আইভিআইজি ও মিথাইলপ্রেডনিসোলোন দেওয়া হয়।
একই দিন বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে আভানের শ্বাস-প্রশ্বাসের অবস্থার আরও অবনতি হলে তাকে ভেন্টিলেটর সাপোর্ট দেওয়া হয়। পাশাপাশি সিভি লাইন স্থাপন করা হয়। পরবর্তীতে কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট হলে সিপিআরের মাধ্যমে হার্টবিট ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করা হয়। তবে সব ধরনের জীবনরক্ষাকারী প্রচেষ্টা ব্যর্থ করে বিকেল ৫টা ২ মিনিটে শিশুটির মৃত্যু হয়।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দাবি, চিকিৎসার বিভিন্ন পর্যায়ে আভানের মাকে শিশুটির শারীরিক অবস্থার অবনতি এবং যেকোনো সময় লাইফ সাপোর্টের প্রয়োজন হতে পারে—এ বিষয়ে অবহিত করা হয়েছিল। এ বিষয়ে পরিবারের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় স্বাক্ষরও নেওয়া হয়।
মৃত্যুর পর শিশুটির সব প্রিন্টেড ইনভেস্টিগেশন রিপোর্ট ও ডেথ সার্টিফিকেট স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে বলেও জানায় হাসপাতাল।
ইউনিভার্সেল মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল আরও জানায়, তাদের পিআইসিইউ ও এনআইসিইউতে দীর্ঘদিন ধরে জটিল অবস্থায় থাকা শিশুদের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। এসব ইউনিটে ২৪ ঘণ্টা শিশু বিশেষজ্ঞ, দক্ষ নার্স ও মেডিকেল অফিসারদের মাধ্যমে চিকিৎসাসেবা পরিচালিত হয়।
এদিকে আভানের মৃত্যু নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চিকিৎসকদের ব্যক্তিগতভাবে আক্রমণ এবং হাসপাতালের বিরুদ্ধে জনরোষ তৈরির চেষ্টা চলছে বলে অভিযোগ করেছে ইউনিভার্সেল মেডিকেল। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দাবি, ফেসবুকে প্রকাশ্যেই হাসপাতালে ‘মব’ তৈরির আহ্বান জানানো হচ্ছে।
হাসপাতালের ভাষ্য, এ ধরনের অপপ্রচার ও সহিংসতার হুমকি শুধু চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের নিরাপত্তাকে ঝুঁকির মুখে ফেলছে না, দেশের সামগ্রিক চিকিৎসাব্যবস্থার ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। জটিল ও মুমূর্ষু রোগীদের চিকিৎসায় চিকিৎসকদের মধ্যে ভীতি তৈরি হলে জরুরি সিদ্ধান্ত গ্রহণও ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
একটি শিশুর মৃত্যু অত্যন্ত বেদনাদায়ক উল্লেখ করে ইউনিভার্সেল মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল বলেছে, ঘটনাটিকে কেন্দ্র করে খণ্ডিত তথ্যের ভিত্তিতে জনরোষ সৃষ্টি না করে প্রকৃত চিকিৎসা-সংক্রান্ত তথ্য ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মূল্যায়নের ভিত্তিতে বিষয়টি দেখা উচিত।
একই সঙ্গে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দ্রুত পদক্ষেপের আহ্বান জানিয়েছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।